সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব ইউরোপের নন-সেনজেনভুক্ত ও বল্কাল দেশগুলোতে (যেমন- সার্বিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া বা আলবেনিয়া) বাংলাদেশী কর্মীদের গমনাগমন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বৈধ ভিসা, কর্মসংস্থান এবং লিগ্যাল রেসিডেন্স পারমিট নিয়ে এসব দেশে যাওয়ার পরও একটি বড় অংশের মাঝে দেখা যায় এক চরম অধৈর্য ও পলায়নপর প্রবণতা। সেখানে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক দিন যাওয়ার পরই তারা সুযোগ খোঁজে কীভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে (যেমন- জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল) পালিয়ে যাওয়া যায়।
নন-সেনজেন দেশগুলোতে এখন কাজের ভালো সুযোগ, নিয়মিত বেতন এবং বৈধভাবে থাকার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই “পলায়নবৃত্তি” বেছে নিচ্ছে? এর পেছনের মনস্তত্ত্ব, স্থায়ীভাবে সফল হতে না পারার কারণ এবং এর ফলে তারা কী ধরনের সংকটে পড়ছে—তা নিয়ে একটি নিবিড় ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ভালো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন এই স্থানান্তর?
নন-সেনজেন দেশগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শ্রমবাজারের ঘাটতির কারণে বর্তমানে এশিয়ান কর্মীদের জন্য বেশ ভালো কাজের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশীদের সেনজেনে যাওয়ার পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ কাজ করে:
- ইউরোর মোহ ও মজুরির পার্থক্য: নন-সেনজেন ও বল্কাল দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রা (যেমন- সার্বিয়ান দিনার বা রোমানিয়ান লেউ) অপেক্ষা সেনজেন অঞ্চলের ইউরোর প্রতি এক অন্ধ আকর্ষণ রয়েছে। একজন কর্মী যখন হিসাব করে যে রোমানিয়া বা সার্বিয়ায় সে মাসে ৫০০-৭০০ ইউরো সমমূল্যের টাকা আয় করছে, অথচ জার্মানি বা ফ্রান্সে গিয়ে অবৈধভাবেও ঘণ্টায় ১০-১২ ইউরো আয় করা সম্ভব, তখন সে দীর্ঘমেয়াদী বৈধতার চেয়ে তাৎক্ষণিক বেশি আয়ের লোভ সামলাতে পারে না।
- শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক (Diaspora Network): ইতালি, ফ্রান্স বা জার্মানিতে আগে থেকেই বিশাল বাংলাদেশী কমিউনিটি রয়েছে। সেখানে লজিস্টিক সাপোর্ট, পরিচিত মুখ এবং অবৈধভাবে কাজ পাওয়ার এক ধরনের নিশ্চয়তা থাকে। পক্ষান্তরে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশী কমিউনিটি এখনো নতুন ও ছোট, যা তাদের একাকীত্ব ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগায়।
- ইউরোপীয় নাগরিকত্বের ‘শর্টকাট’ স্বপ্ন: অনেকের ধারণা, সেনজেনভুক্ত কোনো দেশে একবার ঢুকতে পারলে আজ হোক বা কাল হোক, কোনো না কোনো আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে, অ্যামনেস্টি (বৈধকরণের বিশেষ সুযোগ) পেয়ে বা এসাইলাম (রাজনৈতিক আশ্রয়) চেয়ে স্থায়ী হওয়া যাবে।
২. পালানোর মনস্তাত্ত্বিক দিকসমূহ (The Psychology of the Runaway Mindset)
এই পলায়নপর মানসিকতা রাতারাতি তৈরি হয় না; এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ।
ক) ঋণের বোঝা ও তাৎক্ষণিক সাফল্যের তাড়না
অধিকাংশ বাংলাদেশী অভিবাসী ৫ থেকে ৮ লাখ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ১০ লাখ টাকা ঋণ করে বা জমি বিক্রি করে ইউরোপে আসে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা যখন মাথার ওপর ঋণের সুদ হিসেবে চেপে বসে, তখন তাদের মনস্তত্ত্ব “ধৈর্য ধরে ধীরে ধীরে উন্নতি করার” ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তারা যেকোনো মূল্যে দ্রুততম সময়ে এই ঋণ শোধ করতে চায়। নন-সেনজেন দেশে ২-৩ বছর কাজ করে ঋণ শোধ করার চেয়ে সেনজেনে গিয়ে ১ বছরে শোধ করার অবাস্তব ও ঝুঁকিপূর্ণ স্বপ্ন তাদের তাড়া করে বেড়ায়।
খ) সামাজিক তুলনা ও “স্ট্যাটাস” প্রেসার
বাংলাদেশী সমাজে “কে কোন দেশে আছে” তার ওপর ভিত্তি করে সামাজিক মর্যাদা মাপা হয়। গ্রামে বা আত্মীয় মহলে সার্বিয়া বা রোমানিয়ার চেয়ে প্যারিস, বার্লিন বা রোমের নাম অনেক বেশি ওজনদার।
“অমুকের ছেলে ফ্রান্সে থাকে, ল্যাম্বরগিনির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি দিচ্ছে, আর তুমি কোন এক অচেনা দেশে পড়ে আছ?”—এই ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক কটূক্তি অভিবাসীদের মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে। একে মনস্তত্ত্বের ভাষায় বলা হয় FOMO (Fear of Missing Out) এবং Social Status Anxiety।
গ) আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি দীর্ঘমেয়াদী আস্থার অভাব
আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদী আস্থা রাখতে অভ্যস্ত নয়। তারা মনে করে, “এখন সুযোগ আছে, এখনই কেটে পড়তে হবে; পরে আইন কড়া হলে আর যাওয়া যাবে না।” এই ‘শর্ট-টার্মিস্ট’ বা ক্ষণস্থায়ী চিন্তা তাদের দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার গড়ার পথে বড় বাধা।
৩. সেনজেনে গিয়েও কেন বারবার কোম্পানি ও কাজ পরিবর্তন?
অনেকে মনে করেন, সেনজেনে পৌঁছালেই হয়তো এই পলায়নবৃত্তির অবসান ঘটে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সেখানে গিয়েও তারা কিছু দিন পর পর কোম্পানি পরিবর্তন করে বা আবার পালিয়ে বেড়ায়। এর কারণগুলো হলো:
- অবৈধ স্ট্যাটাস ও ব্ল্যাক মার্কেট ইকোনমি: সেনজেনে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রথম দিকে কর্মীরা কোনো বৈধ চুক্তি বা কাজের পারমিট পায় না। তারা মূলত ‘ক্যাশ ইন হ্যান্ড’ বা নগদ টাকার বিনিময়ে অনানুষ্ঠানিক খাতে (রেস্তোরাঁ, কৃষি, ক্লিনিং) কাজ করে। যেহেতু কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে না, তাই যেখানেই ঘণ্টায় ৫০ সেন্ট বা ১ ইউরো বেশি পাওয়া যায়, কর্মীরা আগের নিয়োগকর্তাকে না জানিয়েই রাতারাতি সেখানে পালিয়ে যায়।
- দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ফাঁদ: অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণ করে এক শ্রেণীর সাব-কন্ট্রাক্টর বা দালাল (যাদের অনেকেই বাংলাদেশী বা দক্ষিণ এশীয়)। তারা কর্মীদের এক কাজ থেকে অন্য কাজে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায়, যাতে প্রতিবার নতুন কর্মসংস্থান থেকে তারা মোটা অঙ্কের কমিশন বা দালালি নিতে পারে।
- অদক্ষতা ও কাজের একঘেয়েমি: অধিকাংশ কর্মীর নির্দিষ্ট কোনো বিশেষায়িত দক্ষতা (Specialized Skill) থাকে না। কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের কাজ যেমন ডিশ ওয়াশিং বা কনস্ট্রাকশনে কিছুদিন কাজ করার পর যখন শরীর আর নিতে পারে না, তখন তারা সহজ কাজের খোঁজে অন্য শহরে বা অন্য কোম্পানিতে পালায়।
৪. এই পলায়নবৃত্তির ফলে সৃষ্ট নানাবিধ অসুবিধা
বৈধ পথ ছেড়ে অবৈধভাবে সেনজেনে পাড়ি জমানোর পর এই অভিবাসীরা যে ধরনের মানবেতর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তা প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়:
- মানবাধিকার ও আইনি সুরক্ষা হারানো: একজন কর্মী যখন একটি দেশের বৈধ রেসিডেন্স পারমিট ত্যাগ করে অন্য দেশে অবৈধভাবে প্রবেশ করে, সে মুহূর্তেই সে তার সব আইনি অধিকার হারায়। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা নিয়োগকর্তা কর্তৃক বেতন না দিলে তাদের কোথাও অভিযোগ করার জায়গা থাকে না।
- চরম আবাসন সংকট ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: খরচ বাঁচানোর জন্য এবং পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে এক একটি ছোট রুমে ১০-১২ জন পর্যন্ত গাদাগাদি করে থাকতে হয়। অনেক সময় বেজমেন্টে বা পরিত্যক্ত জায়গায় সাব-হিউম্যান কন্ডিশনে দিন কাটাতে হয়।
- ডিপোর্টেশন ও স্থায়ী ব্ল্যাকলিস্টের ঝুঁকি: সীমান্ত পার হওয়ার সময় বা সেনজেনের ভেতরে পুলিশের চেকিংয়ে ধরা পড়লে জেল খাটতে হয় এবং “ইউরোপীয় ইউনিয়ন” থেকে স্থায়ীভাবে ডিপোর্ট (বহিষ্কার) ও ব্ল্যাকলিস্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর ফলে পুরো জীবনের বিনিয়োগ এক নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
- মানসিক ট্রমা ও ডিপ্রেশন: প্রতিনিয়ত পুলিশের ভয়, পরিবারের তাগাদা, কাজের অনিশ্চয়তা এবং অপরাধবোধের কারণে এই কর্মীরা চরম মানসিক অবসাদে ভোগে। বাইরে থেকে তাদের জীবন চাকচিক্যময় মনে হলেও ভেতরে তারা এক ধরনের “আধুনিক দাসত্ব” (Modern Slavery) এর শিকার হয়।
৫. কেন সারাজীবনেও অধিকাংশ বাঙালি স্থায়ী উন্নতি করতে পারে না?
ইউরোপে বছরের পর বছর কাটানোর পরও মেজরিটি বাংলাদেশী কেন অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি করতে পারে না, তার মূল কারণগুলো কাঠামোগত এবং মনস্তাত্ত্বিক:
| মূল কারণ | বিবরণ ও প্রভাব |
| ১. দক্ষতার অভাব (Skill Deficit) | অধিকাংশ অভিবাসী কোনো ভাষা শিক্ষা বা কারিগরি দক্ষতা (যেমন- আইটি, ড্রাইভিং, নার্সিং, স্পেশালাইজড কনস্ট্রাকশন) ছাড়াই ইউরোপে আসে। ফলে তারা সারাজীবন সর্বনিম্ন মজুরির অদক্ষ শ্রমিকের স্তরেই আটকে থাকে। |
| ২. ফিনান্সিয়াল লিটারেসির অভাব | যা আয় হয়, তার সিংহভাগই দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় অনুৎপাদনশীল খাতে (যেমন- বাড়ি তৈরি, জমি কেনা বা বিলাসবহুল জীবনযাপন)। নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি বা ইউরোপের মাটিতে কোনো বৈধ ব্যবসা বা সম্পদে বিনিয়োগ করার দূরদর্শিতা তাদের থাকে না। |
| ৩. আইনি ফি ও দালালের পেছনে চক্রাকার ব্যয় | বৈধ হওয়ার আশায় বছরের পর বছর বিভিন্ন ভুয়া ল ইয়ার বা দালালের পেছনে হাজার হাজার ইউরো খরচ করতে হয়। এক দেশে পেপার্স বানাতে না পেরে অন্য দেশে গিয়ে আবার নতুন করে টাকা ঢালতে হয়, যা তাদের সঞ্চয়কে শূন্য করে দেয়। |
| ৪. শর্ট-টার্ম গোল বনাম লং-টার্ম গ্রোথ | তারা সর্বদা আজকের দিনের আয় নিয়ে ভাবে, আগামী ৫ বা ১০ বছর পর তারা নিজেদের কোথায় দেখতে চায়—তার কোনো ব্লুপ্রিন্ট বা রোডম্যাপ থাকে না। এই পলায়নপর মাইন্ডসেট তাদের কখনোই এক জায়গায় স্থির হয়ে ক্যারিয়ার গড়তে দেয় না। |
উপসংহার: মানসিকতার পরিবর্তনই মুক্তির উপায়
নন-সেনজেন ইউরোপীয় দেশগুলো বর্তমানে সেনজেনের দিকে যাওয়ার একটি চমৎকার আইনি স্প্রিংবোর্ড (Springboard) হতে পারত, যদি কর্মীরা ধৈর্য ধরে সেখানে ২-৪ বছর কাজ করে নিজেদের রেকর্ড ভালো রাখত, ভাষা শিখত এবং বৈধ উপায়ে মুভমেন্টের চেষ্টা করত। কিন্তু “দ্রুত বড়লোক হওয়ার” তাড়না এবং পলায়নপর মনস্তত্ত্বের কারণে তারা বৈধ জীবনকে স্বেচ্ছায় অবৈধ ও অন্ধকারচ্ছন্ন করে তুলছে।
পরিশেষে বলা যায়, যতক্ষণ না পর্যন্ত বাংলাদেশী অভিবাসীদের মাঝে “দক্ষতা বৃদ্ধি”, “আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা” এবং “ধৈর্যশীল ক্যারিয়ার গঠনের” মানসিকতা তৈরি হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইউরোপের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও সামষ্টিক ও স্থায়ী অর্থনৈতিক মুক্তি অধরাই থেকে যাবে। চাকা ঘোরানোর জন্য সবার আগে প্রয়োজন এই পলায়নপর চিন্তাভাবনার চাকাটি থামানো।

ধন্যবাদ স্যার আপনাকে। অসাধারণ বিশ্লেষণধর্মী সচেতন মূলক শিক্ষামূলক লেখা লিখছেন। 🌹
Very nice observation.This mantality more in Bangladeshi worker